Monday, September 27, 2010

অতিথি পাখির বিপদসমূহ

অতিথি পাখির বিপদসমূহ

বার্ড ফ্লু - এর মত ভয়াবহ রোগের জীবাণু অতিথি পাখির মাধ্যমে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ে৷ তবে এই জীবাণু সাধারণ মানুষ বা পক্ষীকূলের জন্য বিপদের কারণ নয়৷ কেননা অতিথি পাখি নিজেদের বিচরণ ক্ষেত্র ছাড়া অন্য জায়গায় যায় না৷ তাই দেশী পাখিদের এই রোগে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই৷ তবে মানুষের পাখি শিকার এবং বিক্রয় কর্মকান্ডের কারণে এ রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে৷ যারা পাখি শিকার করে …হেই শিকার– বলে ফেরী করে অতিথি পাখি বিক্রি করে তাদের এ রোগে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷ পাখির মাংস সেদ্ধ হলে এই রোগের জীবাণু মরে যায়৷ তাই যারা খায় তারা নয় বরং যারা এটি বিক্রি করে বা শিকার করে অথাত্‌ পাখির সংস্পর্শে আসে তারা সংক্রমিত হতে পারে৷ তাই এই জীবাণুর সংক্রমণ রোধ করতে হলে অবিলম্বে অতিথি পাখি শিকার বন্ধ করা প্রয়োজন৷

তথ্যসূত্র:
দৈনিক প্রথম আলো ও দৈনিক ইত্তেফাক

Sunday, September 12, 2010

পাখিশুমারির দুই যুগ

পাখিশুমারির দুই যুগপ্রবীণদের পাশাপাশি নবীনরাও এখন পাখিশুমারিতে যোগ দেয়। পাখি দেখায় তাদের দক্ষতা বেড়েছে, বেড়েছে জ্ঞান, সেই সঙ্গে বেড়েছে পাখি ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণের চিন্তা-ভাবনা। পাখিশুমারির ফলাফল এখন জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়
ড. এস এম এ রশীদ

পাখিশুমারি কী? কেন এই পাখিশুমারি? পাখিশুমারি করা সম্ভব কি? অনেকেই এমন প্রশ্ন করেছে। আড়ালে হাসাহাসি করেছে, তবে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আজ পাখিশুমারির দুই যুগেরও বেশি সময় পার হয়েছে।
বন বিভাগের নেতৃত্বে ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশে শীতকালীন জলচর পাখিশুমারি শুরু হয়। এর জাতীয় সমন্বয়কারী হিসেবে আবদুল ওয়াহাব আকন্দকে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োগ দেওয়া হয় (তখন পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ছিল না)। এরই অংশ হিসেবে আমি প্রথম উপকূলীয় অঞ্চলের নোয়াখালী এলাকায় শীতকালীন জলচর পাখিশুমারির কাজ শুরু করি। ওসমান গনি তখন মাইজদীতে বন বিভাগের নোয়াখালী উপকূলীয় অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা। তিনি পাখিশুমারি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা করেন। সেই সময় হাতেগোনা দুই-একজনের কথা উল্লেখ করা যায়, যাঁরা আন্তরিকভাবে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পাখি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, যেমন ড. সোহরাব উদ্দিন সরকার, ড. আলী রেজা খান, প্রয়াত ড. নজরুল হক, ড. নূরজাহান সরকার, ড. আনিসুজ্জামান খান, রাগীব উদ্দিন আহমদ, ড. রোনাল্ড হালদারসহ আরো কয়েকজন। যারা নিয়মিত না হলেও প্রায়ই তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা আমাদের বলতেন এবং পরামর্শ দিতেন, তাঁদের মধ্যে প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন, মরহুম জি এম এম ই করিমের নাম উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে বসবাসরত কিছু বিদেশিও পাখি দেখায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। যেমন ডেভ জনসন (অ্যাডভেন্টিস্ট ডেন্টাল ক্লিনিক), বিল হারভে (ব্রিটিশ কাউন্সিল) এবং ড. পল থমসন।
শৈশব থেকেই প্রকৃতি ও এর অলংকার পাখি দেখার সঙ্গে আমি জড়িত। এর জন্য প্রশংসার দাবিদার আমার বড় ভাই গ্রুপ ক্যাপ্টেন মতিন (অবসরপ্রাপ্ত)। তবে পাখি দেখার বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য উপলব্ধি করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে অধ্যয়নকালে প্রফেসর কাজী জাকের হোসেন ও ড. আলী রেজা খানের কাছ থেকে। মাঠে-ঘাটে ঘোরা ও বন্য প্রাণী দেখার সেই নেশা আজ অবধি ছাড়তে পারিনি। বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়েও এই নেশা পিছু ছাড়েনি।
১৯৮৭ সালে হাতিয়ার নলচিরা, চর ভাটা, শাহেবানি চর, ঘাসিয়ার চর, ঢাল চর, নিঝুম দ্বীপ, চর রওশন, চর বাহাউদ্দিন থেকে আমি যে পাখিশুমারি শুরু করি আজ তা কলেবরে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিবছর পাখি গণনাকারীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনরাও এখন পাখিশুমারিতে যোগ দেয়। পাখি দেখায় তাদের দক্ষতা বেড়েছে, বেড়েছে জ্ঞান, সেই সঙ্গে বেড়েছে পাখি ও তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণের চিন্তা-ভাবনা। পাখিশুমারির ফলাফল এখন জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়।
সেই শুমারিতে প্রথম বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে বহু বিরল প্রজাতির পাখির শীতকালীন আবাসস্থল হিসেবে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা হয়। এই শুমারির ফলে জানা যায়, আমাদের উপকূল চামচ-ঠুঁটো চাপাখির প্রধান শীতকালীন আবাসস্থল। চামুচ-ঠুঁটো চাপাখি সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসে। গাং চষা পাখিরও সবচেয়ে বড় দল হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপের উপকূলে বাস করে। তা ছাড়া ক্র্যাব প্লোভারের অস্তিত্বও পাওয়া যায় এখানে, যা আগে জানা ছিল না। পাখিশুমারিতে বেরিয়ে আসে এমন আরো অনেক চমকপ্রদ তথ্য।
প্রথম বছরে এত মূল্যবান তথ্য পাওয়ায় পরের বছর ১৯৮৮ সালে এশিয়ান ওয়েটল্যান্ড ব্যুরো থেকে জন হোয়েজ, ডেভ বেকওয়েল ও সুজান হোয়েজ বাংলাদেশে আসেন এবং জলচর পাখির বৈচিত্র্য ও বিশাল সমারোহ দেখে মুগ্ধ হন। তাঁরা বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে পরিযায়ীসহ আরো জলচর পাখির জন্য পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলেশিয়া (ওশেনিয়া অঞ্চল) এবং মধ্য এশিয়াকে অভিবাসী পাখির গমনপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
সেই সময় থেকেই পাখিশুমারি ও জলাভূমি সংরক্ষণের প্রয়োজন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
পরে বন বিভাগ এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কিছু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কর্মকর্তা, আইডবি্লউআরবি, ইন্টারওয়েডার এবং নেকম আলাদাভাবে রামসার কনভেনশন স্বাক্ষরের জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানান। অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর ১৯৯২ সালে সুন্দরবনকে বাংলাদেশের প্রথম রামসার সাইট হিসেবে ঘোষণা দিয়ে রামসার কনভেনশন স্বাক্ষর করা হয়। পাখিশুমারি কার্যক্রমের এটি একটি বড় সাফল্য।
ইংল্যান্ডের ডারেল ইনস্টিটিউট অব কনজারভেশন অ্যান্ড ইকলোজি, ক্যান্টারবারির ইউনিভার্সিটি অব কেন্ট থেকে উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৯২ সালে দেশে ফিরে আসি এবং নেকমের পক্ষে পাখিবিদ ড. ডেরেক স্কটের সঙ্গে যৌথভাবে ক্যানাডিয়ান সিডা-র জন্য পাখি জরিপ করি। এরই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের বেশ কিছু জলাভূমিকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণার জন্য প্রস্তাব করি। এর মধ্যে আছে টাঙ্গুয়ার হাওর, গুরমার হাওর, হাকালুকি, হাইল, কাওয়াদীঘি, বালাই ও মুরালি হাওর। পরবর্তীতে নেকম ফ্লাড অ্যাকশান প্লানের আওতায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের জলাভূমি ও জলজসম্পদ সংরক্ষণের জরিপ করা হয়।
পাখিশুমারি বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে একটি নতুন পরিচয় দিয়েছে, আমাদের দেশে পাখির বিভিন্ন প্রজাতির তালিকায় যোগ করেছে নতুন প্রজাতি। তাদের আবাসস্থল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বাড়িয়েছে, তাদের সংরক্ষণের জন্য জনমত ও সচেতনতা বাড়িয়েছে, সরকার ও জনগণকে পাখি সংরক্ষণে উদ্বুদ্ধ করেছে। যাঁরা প্রথমদিকে হাসাহাসি করেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন পাখিশুমারিতে যোগ দিয়েছেন।
চার বছর ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিডাবি্লউবিএমপি-এর আওতায় প্রতি বছর পাখিশুমারি হচ্ছে। এখন শৌখিন পাখি পর্যবেক্ষকরাও নিয়মিত পাখি ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছেন। তাঁরা পাহাড়, বন, চর, জলাভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পাখি সম্পর্কে নতুন তথ্য জানাচ্ছেন। পাখি ও বন্য প্রাণী নিয়ে সরকারের কর্মপরিধিও বেড়েছে। ফলে দেশে বাড়ছে বন্য প্রাণীর জন্য সংরক্ষিত এলাকা। পাখি সংরক্ষণের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের বংশ বৃদ্ধি করিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অবদান রাখা সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস। আর এর খাতিরে পাখিশুমারির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও শৌখিন পর্যবেক্ষকদের পৃষ্ঠপোষকতা করা বাঞ্ছনীয়। সেই লক্ষ্যে প্রতিবছর পরিকল্পনামাফিক এ কাজটি পরিচালনার জন্য সরকারের বাজেটে বরাদ্দ রাখা উচিত।
আমি মনে করি, এ কাজের যথোপযুক্ত সরকারি সংস্থা পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের বাৎসরিক বাজেটে বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ ও শৌখিন পর্যবেক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে মাঠ পর্যায়ে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য আপাতত ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে পারে।

লেখক : নির্বাহী প্রধান, সেন্টার ফর অ্যাড্ভান্সড রিসার্চ ইন ন্যাচারাল রিসোর্সেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (ক্যারিনাম)

Source: Dailykalerkantho

পাখি রক্ষায় এগিয়ে আসুন :শেখ রেহানা

পাখি রক্ষায় এগিয়ে আসুন :শেখ রেহানা

বার্ডস অব বাংলাদেশের মোড়ক উন্মোচন


০০ইত্তেফাক রিপোর্ট, জানুয়ারি ১৩, ২০১১,

পাখি রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠা কন্যা শেখ রেহানা। গতকাল বুধবার পাখি বিষয়ক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেন, 'পশু-পাখি হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ। এগুলো রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে, মূল্যবান এই সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাবে।'

রাজধানীর বসুন্ধরায় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) ক্যাম্পাসে প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ রোনাল্ড আর হালদার রচিত বার্ডস অব বাংলাদেশ শীর্ষক ছবি সম্বলিত নির্দেশনামূলক এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক এম ওমর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান তৌহিদ সামাদ, বইয়ের লেখক রোনাল্ড আর হালদার, স্কুল অব এনভায়রনমেন্ট সাইন্স এন্ড ম্যানেজমেন্টের পরিচালক অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, আইইউসিএন'র কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. নিয়াজ আহমেদ খান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি ইনাম উল হক ও পরিবেশবিদ ইনাম তালুকদার।

শেখ রেহানা বলেন, পাখি সকলের প্রিয়। পাখি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। পাখি কবি ও ছড়াকারদেরও ভাবের বিষয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সম্পদ হিসেবে পাখির তুলনা নেই। তাই পাখিদের বাঁচান। দুর্বল প্রজাতির এই প্রাণীকে রক্ষায় সকলকে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, পাখির স্বভাবজাত সৌন্দর্যকে স্বাধীনভাবে থাকতে দিন। কারণ জীবনের শত ব্যস্ততার মধ্যেও এই সৌন্দর্য আমাদের চিত্তে শান্তি এনে দিতে পারে।

স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, বাবা তার জীবনের একটা বড় অংশ জেলে কাটিয়েছেন। জেলে থাকা অবস্থায় তিনি পশু-পাখিদের নিয়ে নিঃসঙ্গ জীবনের সময় কাটাতেন। তার এই ভালোবাসার কারণেই স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে তিনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধ্যাদেশ জারি করেন। প্রকাশিত বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, বইটি পর্যটক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য সহায়ক হবে। বিদেশীদের কাছে এদেশের পাখির পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হবে।

অনুষ্ঠানে অন্য বক্তারা বলেন, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখি রয়েছে। তাদের আবাসস্থল ধ্বংস এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে প্রতি ৪ বছরে একটি প্রজাতির পাখি হারিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি ৮ প্রজাতির পাখির মধ্যে ২ প্রজাতির অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন। গত ৪০ বছরে আমাদের দেশের অনেক প্রজাতির পাখিও বিলুপ্ত হয়েছে।

বার্ডস অব বাংলাদেশ বইটিতে ৪৭০ প্রজাতির পাখির ছবিসহ বর্ণনা দেয়া হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় রচিত এই বইয়ের মূল্য এক হাজার টাকা। এটি বাংলাদেশের পাখির ছবি সম্বলিত একমাত্র নির্দেশনামূলক গ্রন্থ। বইয়ের রচয়িতা রোনাল্ড আর হালদার পেশাগত জীবনে একজন দন্ত চিকিৎসক। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর যাবৎ পাখি গবেষণার কাজ করে আসছেন।

Friday, September 10, 2010

বাঁচতে এসেছিল ওরা! প্রকৃতির সন্তান

বাঁচতে এসেছিল ওরা!

দূরদেশের প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে এসেছিল ওরা। আশ্রয় নিয়েছিল এ দেশেরই এক হাওরে। নির্ভাবনায় ঝাঁক বেঁধে হুটোপুটি করতে করতে খাবার খুঁজছিল। একপর্যায়ে পেয়েও যায় লোভনীয় খাবার। কিন্তু সে খাবার খেয়ে সতেজ হয়ে ওঠেনি ওরা। বরং নিস্তেজ হয়ে একে একে হারিয়ে যায় মৃত্যুর ঠিকানায়। এভাবে পাখিশিকারিদের বিষটোপের বলি হয় অতিথি পাখিগুলো।
গত সোমবার বিকেলে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের হাকালুকি হাওরের চান্দের বিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে ৩২টি মৃত পাখি উদ্ধার করা হয়েছে। বিষটোপ খেয়ে স্থানীয় একটি খামারের প্রায় ২৫০টি হাঁস মারা যায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পরিবেশ অধিদপ্তরের গ্রাম সংরক্ষক দলের (ভিসিজি) দুই পাহারাদার আজির উদ্দিন (৪০) ও ছনু মিয়াকে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে এই দুজনসহ চারজনের বিরুদ্ধে বড়লেখা থানায় বন আইনে মামলা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, উপজেলা প্রশাসন ও হাকালুকি হাওরের উন্নয়নে কর্মরত পরিবেশ অধিদপ্তরের উপকূলীয় ও জলাভূমি জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (সিডব্লিউবিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার বেলা তিনটার দিকে সুজানগর ইউনিয়নের ভোলারকান্দি গ্রামের মুসলিম আলী ও সামছু মিয়া মাছের ঝুড়ি নিয়ে চান্দের বিল এলাকা থেকে আজিমগঞ্জ বাজারে ফিরছিলেন। পথে সন্দেহ হলে সিডব্লিউবিএমপির ভিসিজি পাহারাদার আজির উদ্দিন ও ছনু মিয়া তাঁদের আটকান।
পুলিশের কাছে দেওয়া আজির উদ্দিন ও ছনুর ভাষ্যমতে, মাছের ঝুড়ির ঢাকনা খুলে তাঁরা বেশ কিছু মৃত অতিথি পাখি দেখতে পান। এ সময় বিপদ টের পেয়ে মুসলিম ও সামছু ওই ঝুড়ি ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যান।
ঘটনা জানাজানি হলে স্থানীয় সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, সিডব্লিউবিএমপির কুলাউড়া কার্যালয়ের উদ্যান কর্মকর্তা আবদুল মালেক, বন বিভাগের বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মৌলভীবাজার কার্যালয়ের রেঞ্জ কর্মকর্তা মিয়া সিরাজুল হক ঘটনাস্থলে যান।
আবদুল মালেক জানান, তাঁরা ঘটনাস্থল থেকে পাতি সরালি ও লেনজা হাঁস জাতের ৩২টি মৃত অতিথি পাখি উদ্ধার করেন। পাখিগুলো জবাই করা ছিল।
বড়লেখা থানার দ্বিতীয় কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন জানান, অতিথি পাখি নিধনের ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে সোমবার রাতে মিয়া সিরাজুল হক বাদী হয়ে মুসলিম আলী, সামছু মিয়া, আজির উদ্দিন ও ছনু মিয়ার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন। শিকারিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগে আজির ও ছনুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বড়লেখা উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, বিষটোপ খেয়েই পাখিগুলো মারা গেছে। বিষের ধরন পরীক্ষা করতে চারটি মৃত অতিথি পাখি ঢাকার কেন্দ্রীয় পশুরোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে পাঠানো হচ্ছে।

প্রকৃতির সন্তান

কবি রণজিত্ দাশগুপ্ত লিখেছিলেন, বৃক্ষে হাত রেখে কবি টের প্রায় প্রাণ, আর ব্যবসায়ী দেখে কেবলই কাঠ। যখন হাকালুকি হাওরে হাজার হাজার পাখির কলকাকলিতে কেউ দেখে প্রকৃতির অপরূপ লীলা, তখন একদল শিকারি দেখে একগুচ্ছ স্বাদু মাংসের ওড়াউড়ি। অথচ পাখি হলো প্রকৃতির শিশু। পাখির সৌন্দর্য আমাদের মধ্যে মমতার অনুভব জাগায়। অথচ এসব ভুলে অতিথি পাখি শিকার করা বা তার মাংস খাওয়ার জন্য বিক্রি করা হয়। এটা কেবল নিষ্ঠুরতাই নয়, বর্বরতারই নামান্তর। প্রতিবছর শীতের শেষাশেষি আমাদের বিল-হাওরগুলো দূর-দূরান্তর থেকে আসা নানা জাতের অতিথি(নাকি পরিযায়ী?) পাখিতে ভরে যায়। এবারও তাই ঘটেছে হাকালুকি হাওরে (সূত্র: প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি)। দর্শনার্থীদের উত্পাত, পাখিভক্ষক শিকারিদের আক্রমণ যেখানে থাকে না, সেখানে রংবেরঙের অজস্র পাখিতে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তা কেবলই দেখার জিনিস, খেয়ে ফেলার জিনিস নয়! তার পরও একশ্রেণীর মানুষ পাখির মাংসের লোভ সংবরণ করতে পারে না। এমনকি অনেক হোটেলকেও পাখির মাংসের রান্না পরিবেশনের বড়াই করতে দেখা যায়। তারা কি ভেবে দেখেছে, কেবল রসনা আর ব্যবসার জন্য তারা শুধু প্রকৃতিরই ক্ষতি করছে না, মানুষ হিসেবেও অনেক হীন কাজে লিপ্ত হচ্ছে। কিছু মানুষ সাধারণত মৌসুমি পেশা হিসেবে পাখি শিকার করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের জন্য নয়, শহর-বাজারে বিক্রির জন্যই তারা ফাঁদ পেতে পাখি ধরে বা শিকার করে। তাই, তাদের কাছ থেকে পাখি কেনা বন্ধ করলে শিকারিরা নিরুত্সাহিত হতে পারে। তবে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন পরিবেশ মন্ত্রণালয়সহ পুলিশ প্রশাসনের। এমনকি যেসব এলাকার বিল-হাওর-জলাশয়ে অতিথি পাখির সমাগম হয়, সেসব এলাকার স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদেরও উচিত এগিয়ে আসা।
Source: www.krishe.com

Wednesday, September 8, 2010

বাংলাদেশের পাখিশুমারি

বাংলাদেশের পাখিশুমারি গাজী মুনছুর আজিজ,০২ জানুয়ারি ২০১১

চারপাশে নদী। মাঝেখানে জেগে ওঠা বিশাল চর। নির্জন এই চরে মানুষের কোনো বসতি নেই। তবে বসত করছে নানা প্রজাতির বর্ণিল রংয়ের ছোট-বড় হাজারও পরিযায়ী পাখি। আর এসব পাখি দেখার জন্য প্রতি বছর শীতকালে দলে দলে পাখিপ্রেমিক পর্যটক ছুটে যান উপকূলের চরগুলোতে। কেবল পাখি দেখার জন্যই নয়, তারা তুলে আনেন এসব পাখির সংখ্যা, পাখির জাত-প্রজাতি। আর ক্যামেরাবন্দী করেন এসব পাখির আলোকচিত্র, ভিডিও এবং কণ্ঠস্বর। তারপর মানুষকে জানিয়ে দেন পরিবেশ ও প্রকৃতির অনন্য বন্ধু এসব পাখির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। আর এর মাধ্যমে তারা খুঁজে পান অন্যরকম আনন্দ।

পাখি দেখার এমন আনন্দ পেতেই গত বছরের ৭ জানুয়ারি বিকালে ঢাকা সদরঘাট থেকে একদল পাখিপ্রেমীর সঙ্গে লঞ্চযোগে রওনা দেই উপকূলীয় জেলা ভোলায়। উদ্দেশ্য উপকূলীয় জলচর পাখিশুমারি। দশজনের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি নিয়ে গবেষণাকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়কারী ইনাম আল হক। তার নেতৃত্বেই প্রতি বছর বাংলাদেশে জলচর পাখিশুমারি হয়ে থাকে। ৮ জানুয়ারি সকালে আমরা ভোলার ঘোষেরহাট লঞ্চঘাটে পেঁৗছাই। লঞ্চ থেকে নেমে ভাড়া করা ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় রওনা হই চর ফ্যাশনের শাহজালাল চরের দিকে।
মেঘনা নদী দিয়ে নৌকা এগিয়ে চলে। মাঝে-মধ্যে দেখা যায়, ছোট পানচিল নদী থেকে মাছ তুলে নিচ্ছে। চোখে পড়ে জেগে ওঠা ছোট ছোট চর। আর সে চরে বসে আছে নানা রংয়ের নানা প্রজাতির পাখি। আমাদের পাখিপ্রেমীরা দুরবিন দিয়ে এসব পাখি দেখেন, ছবি তোলেন এবং খাতায় লেখেন এর সংখ্যা।
প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর নৌকা আসে শাহজালাল চরে। এই চরের এক পাশে বিশাল কেওড়া বন অন্যপাশে মেঘনা নদী। চরে নেমে বনের পাশেই শুকনো বালুতে আমরা রাতে থাকার জন্য ছোট-বড় চারটি তাঁবু তৈরি করি। তাঁবু তৈরি করতে করতে সন্ধ্যা নেমে আসে। সূর্য ডুব দেয় মেঘনায়। সন্ধ্যায় নদীর তীরে সবাই বসে চা খেতে খেতে পাখির গল্প শোনান ইনাম আল হক।
রাতে নিশিবকের ডাক শুনতে শুনতে ঘুমাই আর সকালে ঘুম ভাঙে বনের পাখির কিচিরমিচিরে। চরে ঘুমানোর এই প্রথম অভিজ্ঞতা। মনে হলো অন্যরকম ভালো লাগার কথা। প্রায় ১৫ বছর আগে এই চরটি জেগে ওঠে। তখন সরকারিভাবে একে বনায়ন করা হয়। সকাল সাতটার আগেই সবাই ঘুম থেকে উঠি। তৈরি হই পাখি দেখতে। নৌকায় রান্না করা গরম খিচুড়ি খেয়ে রওনা দিই পাখির খোঁজে। আমাদের কারও হাতে ক্যামেরা, কারও হাতে দুরবিন বা টেলিস্কোপ। কিংবা কারও হাতে শুমারির কাগজ, কেউ বা করছেন ভিডিও। বিশাল এই চরে প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে কিংবা কখনো ছোট নৌকা করে দূরের ছোট্ট চরে গিয়ে আমরা দেখেছি ৪১ প্রজাতির প্রায় ১৪ হাজার পরিযায়ী পাখি। এসব পাখির মধ্যে আছে দেশি কানিবক, গো-বগা, মাঝলা বগা, ধুপনি বক, কালামাথা কান্তেচরা, পাতি চখাচখী, ইউরেশিও সিঁথিহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, উত্তুরে লেঞ্জাহাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, পাকড়া উল্টোঠুটি, ছোট নথজিরিয়া, কালালেজ, জৌরালি, নাটা গুলিন্দা, ইউরেশিও গুলিন্দা, ছোট পানচিল, ছোট পানকৌড়ি, ছোট বগা, বড় বগা, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, প্রশান্ত সোনাজিরিয়া, মেটে জিরিয়া, পাতি লালপা, পাতি সবুজপা, পাতি বাটান, টেরেক বাটান, জুলফি পানচিল, খয়রামাথা গাঙচিল, কাসপিয়ান পানচিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।
দলনেতা ইনাম আল হক টেলিস্কোপে এসব পাখি সবাইকে দেখান আর সেই সঙ্গে বলেন পাখির নাম, প্রজাতি, আবাসন, খাদ্যসহ বিভিন্ন বর্ণনা। সত্যিই নতুন নতুন পাখি দেখে, তার নাম শুনে খুঁজে পাই অন্যরকম আনন্দ। একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পাখি দেখার কাজ। তারপর সন্ধ্যায় ফিরি তাঁবুতে। সারাদিন চরে রোদের মধ্যে কখনো বালুতে, কখনো কাদা মাটিতে কিংবা কখনো শক্ত ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁটে আমরা সবাই কিছুটা ক্লান্ত ছিলাম। তারপরও সবার মুখে ছিল নতুন পাখি চেনার আনন্দ। পরদিন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে তাঁবু গুছিয়ে আমরা রওনা হই ঘোষেরহাট লঞ্চঘাটের উদ্দেশে। পথে আমরা পাখি দেখি ঢালচর, কলমীরচর ও এর আশপাশের ছোট ছোট চরগুলোতে। পেঁৗছাই বেলা তিনটায়। তারপর উঠি লঞ্চে। লঞ্চ ছাড়ে। পরদিন ভোরে আসি ঢাকায়। এর আগে ২০০৯ সালে আরও একবার গিয়েছিলাম উপকূলীয় এলাকায় জলচর পাখি শুমারি করতে। ১৬ থেকে ২৩ জানুয়ারি এই শুমারি অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের সঙ্গে ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী ড. রোলান্ড হালদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাগ বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল খান, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের পাখি পর্যবেক্ষক এম এ মুহিত, সামিউল মোহসেনিন, সায়েম ইউ চৌধুরী ও সীমান্ত দীপু।
ঢাকা সদর ঘাট থেকে ১৫ জানুয়ারি রাত ৮টায় এমভি গ্লো্লরি অব শ্রীনগর-৩ লঞ্চে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। সেবার ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, নোয়াখালী জেলার বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকার প্রায় ২০টি চরে ৪৯ প্রজাতির প্রায় ৬০ হাজার পরিযায়ী পাখি শুমারি করা হয়েছে। এ ছাড়াও ছোটখাটো অন্যান্য চরেও উড়ন্ত অবস্থায় দেখা গেছে আরও প্রায় ৪০ হাজার পাখি।
বাংলাদেশের পাখি শুমারি বিষয়ে ইনাম আল হক বলেন, বিশ্বব্যাপী পাখি নিয়ে গবেষণা করছে 'ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল' (ডবি্ল্লউআই) সংস্থা। এই সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের সংগঠনের নাম 'এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাস' (এডবি্ল্লউসি)। এই সংস্থা প্রতি বছর শীতকালে এশিয়ার দেশগুলোতে একযোগে জলচর পাখিশুমারি করে থাকে। এই সংস্থার বাংলাদেশের জাতীয় সমন্বয়ক বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। এই ক্লাবের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে প্রায় ২০ বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয়, হাওর-বাঁওড় ও উপকূলীয় এলাকায় আমরা এই পাখিশুমারি করে আসছি। আমাদের শুমারির এই ফলাফল ওয়েটল্যান্ডস ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রকাশানায় তুলে ধরে।
Source: www.bangladesh-pratidin.com

Friday, September 3, 2010

পদ্মার চরে বিরল ‘বাংলা বাবুই’ পাখির বাসা

পদ্মার চরে বিরল ‘বাংলা বাবুই’ পাখির বাসা

সৌরভ মাহমুদ

‘বাংলা বাবুই’ পাখির বাসা

পাখিটি এখনো আমাদের দেশের বিপন্ন পাখির তালিকায় আসেনি। অথচ বাংলা বাবুই (Ploceus bengalensis) দক্ষিণ এশিয়ার একটি এন্ডেমিক পাখি। এন্ডেমিক বলতে বোঝায় কোনো প্রজাতির নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক স্থানে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া। এ বাবুই বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমাদের তিন প্রজাতির বাবুই হলো দেশি বাবুই (Ploceus philippinus), দাগি বাবুই (Ploceus manyar) ও বাংলা বাবুই। এদের মধ্যে দেশি বাবুই দেশের সব গ্রামের তাল, নারিকেল, খেজুর, রেইনট্রি গাছে দলবেঁধে বাসা বোনে। কিন্তু বাংলা ও দাগি বাবুই বিরল।

বাংলা বাবুই
দাগি বাবুই
দেশি বাবুই

সম্প্রতি সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসের (সিইজিআইএস) হয়ে বন্য প্রাণী ও গাছপালাবিষয়ক এক গবেষণার কাজে পদ্মার একটি চরে গিয়ে দেখা গেছে এই বাসা। মাত্র একটি বাসাই ছিল। চরটিতে দেশি মেটে হাঁস, কোড়া, ধলা চিল, বিপন্ন নাকতা হাঁস, ভ্রমর ছোটন, কয়েক প্রজাতির বুশ লার্ক ও প্রিনিয়াও দেখে গেছে। গবেষক দলের প্রধান ছিলেন সিইজিআইএসের পরিবেশবিজ্ঞানী ইশতিয়াক সোবাহান।

বাংলা বাবুই

বাংলা বাবুইয়ের বাসা করার জন্য প্রয়োজন হয় নলখাগড়া ও হোগলার বন। কিন্তু দেশে নল ও হোগলার বন কমে যাওয়ায় এই বাংলা বাবুইয়ের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া এই পাখি যেখানে বাস করে—নল ও হোগলার বনে—সেখানে মানুষের চলাচল থাকে। আর বাসা বোনে মানুষের হাতের নাগালে পাঁচ থেকে ছয় ফুট ওপরে। তাই সহজেই গ্রাম কিংবা চর এলাকার অসচেতন মানুষ এদের বাস ভেঙে ফেলে। এ কারণে অধিকাংশ বাংলা বাবুই ছানা ফুটিয়ে বড় করে তুলে নিতে পারে না।

বাবুই

বিশিষ্ট পাখি পর্যবেক্ষক ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক জানান, ‘বাংলা বাবুই, যার নামের শেষে বেঙ্গেলেনসিন আছে, তাই এরা বাংলারই বাবুই। তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এ পাখি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে মাত্র ১০০টি বাংলা বাবুই থাকতে পারে।’ তিনি অরও জানান, ‘২০০৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনের এক গ্রামে হোগলার বনে কিছু বাসা দেখেছিলাম, কিন্তু কয়েক দিন পর গিয়ে আর একটি বাসাও দেখতে পাইনি; মানুষ ভেঙে ফেলেছে!’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান জানান, তিনি যমুনার একটি চরে ১৯৯৫ সালে বাসা ও একঝাঁক বাংলা বাবুই দেখেছিলেন।

একঝাঁক বাংলা বাবুই

যেহেতু এ পাখি মানুষের খুব নাগালে বাসা বোনে, তাই মানুষের সচেতনতাই পারে এ পাখির বংশ টিকিয়ে রাখতে। তা ছাড়া এ পাখির যে চরে বিচরণ আছে এবং বাসা বোনে, অন্তত সে রকম একটি চরকে সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা কিংবা পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। কারণ একটি প্রজাতি হারিয়ে গেল তাকে আর কোনো দিন পৃথিবীতে ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়!

http://rezowan.wordpress.com

Monday, August 30, 2010

গোপীনাথপুরে বসেছে পাখির মেলা

গোপীনাথপুরে বসেছে পাখির মেলা
Tuesday, 31 August 2010
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি : শীত আসতে আরও মাস দুয়েক বাকি। অথচ গোপীনাথপুর এখনই পাখির মেলা বসেছে। পদ্মার কোলঘেঁষা এ গ্রামে বাসা বেঁধেছে হাজারও পাখি। নানা বর্ণের-রঙের পাখি। এ গ্রামের কোথাও তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা নেই। ঝোপঝাড়, বাঁশবন, পুকুর কিংবা খালে দলবেঁধে বসে আছে বক, বেলে হাঁস, পানকৌড়ী, চখা, মাছরাঙাসহ আরও অনেক জাতের পাখি।
বছর কয়েক আগে একই গ্রামে ছিল পাখির অভয়াশ্রম। কিন্তু পদ্মার ভাঙনে পাখির সেই অভায়শ্রম তলিয়ে যায়। হারিয়ে যায় পাখির মেলা। এরপর ওই গ্রামে আর পাখি দেখা যায়নি। এ বছর আকস্মিকভাবে দেশীয় সব জাতের পাখি এসে গোপীনাথপুর গ্রাম ওদের দখলে নিয়েছে। পাখির গানে এখন এ গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙছে। অস্ত যাচ্ছে সূর্য। গ্রামবাসী বলছেন, গ্রামেও সুখ এসেছে। তাদের আশা, এবার শীতে হয়তো ভিনদেশী পাখিরাও এদের সঙ্গে মিশে পাখির মহামিলন হবে গোপীনাথপুরে। এখনই মানুষ আর পাখির মধ্যে গড়ে উঠেছে নিবিড় সম্পর্ক আর ভালবাসা। এলাকাবাসী জানান, এক সময় হরিরামপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রাম ছিল পাখির অভয়ারণ্য। সে গ্রামে প্রতিদিন কয়েকশ’ মানুষ পাখির মেলা দেখতে আসতো। কিন্তু সে অভয়ারণ্যটি হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। সেখানকার গাছপালা, গ্রামের মানুষের ঘরের চালা থেকে শুরু করে সবখানেই পাখির বাসা ছিল। সেই পাখির অভয়ারণ্যটি গিলে খেয়েছে রাক্ষুসে পদ্মা। পাখিগুলো অভিমান করে সেখান থেকে চলে গেছে। এরপর সেখানে আর পাখির কোলাহল দেখা যায়নি। দেখা যায়নি পাখিদের মিছিল। অথচ আজ বহুদিন পর আবার নতুন করে পাখির অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে গোপীনাথপুর গ্রাম। এ আনন্দ কোথায় ধরে রাখি।
Source: www.mzamin.com

Thursday, August 5, 2010

হাকালুকি হাওরের স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারযুক্ত অতিথি পাখি এখন সাইবেরিয়ায়

হাকালুকি হাওরের স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারযুক্ত অতিথি পাখি এখন সাইবেরিয়ায়

হাকালুকি হাওরের স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার সংযুক্ত অতিথি পাখি এখন সাইবেরিয়ায়। ট্রান্সমিটারযুক্ত কিছু পাখি হিমালয়ের লাদাক আর কিছু চীনের হ্রদে অবন্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিএস বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের পাঠানো তথ্য অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাখি বিশেষজ্ঞ বশির আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
হাকালুকি হাওরের স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার সংযুক্ত অতিথি পাখি এখন সাইবেরিয়ায়। ট্রান্সমিটারযুক্ত কিছু পাখি হিমালয়ের লাদাক আর কিছু চীনের হ্রদে অবন্থান করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসজিএস বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে। তাদের পাঠানো তথ্য অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাখি বিশেষজ্ঞ বশির আহমদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০০৯ সালের মার্চ মাসে দেশের বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে ১৬টি পাখির গায়ে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার এবং ৩৪টি পাখির পায়ে বিশেষ রিং পরানো হয়। সেসময় বলা হয়েছিল, পাখিগুলো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে গেলে এদের গতিবিধি ও অবস্থান জানা যাবে। ইন্টারনেটের গুগল আর্থ-এর মাধ্যমে পাখিগুলোর গতিবিধি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছে ইউএসজিএস (ইউনাইটেড স্ট্যাট জিওলজিক্যাল সার্ভে)। ইউএসজিএস-এর মাধ্যমে পরিবেশ অধিদপ্তরের সিডব্লিউবিএমপির পাখি বিশেষজ্ঞ বশির আহমদ গতকাল জানান, হাকালুকি হাওর থেকে পাখিগুলো ছাড়ার পর কিছু পাখি চীনের হ্রদে, কিছু পাখি হিমালয়ের পাদদেশ লাদাকে এবং কিছু পাখি সাইবেরিয়ায় পৌঁছেছে।
তবে কয়েকটি স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার কাজ করছে না। ফলে আর কিছু পাখির গতিবিধি জানা যাচ্ছে না। যে সব স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার কাজ করছে না সেগুলো পাখির গা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যেতে পারে। তিনি আরো জানান, মূলত পাখিগুলোর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে ইউএসজিএস। তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের সিডব্লিউবিএমপিকে পাখির সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে জানায়। গত ১৭ জুলাই পাখিগুলো সাইবেরিয়া পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইউএসজিএস।
- রাজগৌরীপুর ডেক্স-এমএইচকে/০৩-০৮-১০
Source: http://rajgouripur.com

Wednesday, March 10, 2010

পাখির গ্রাম ভাটিনা

পাখির গ্রাম ভাটিনাযতই ভেতরে ঢুকছি ততই পাখির কিচিরমিচির শব্দ চারপাশ থেকে আমাদের ঘিরে ধরছে। আমরা থমকে দাঁড়াই। বাঁশঝাড়ের ডালে ডালে শত শত পাখি। চড়ুই, শালিক, টিয়া, বক, মাছরাঙা, ঘুঘুসহ নানা রকমের পাখি। সবাই বুঝি আনন্দে চেঁচাচ্ছে সালেক খোকন
বন্ধু শামীমের বাসায় বেড়াতে এসেছি দিনাজপুরে। বিখ্যাত কান্তজী মন্দির, রামসাগর আর নয়নাভিরাম শালবন দেখে ভালোই কাটছে দিনগুলো। কাটারীভোগ চালের ভাতের সঙ্গে রুস্তম হোটেলের গরু ভুনা, মুন্সির হোটেলের খাসি আর ভাবির হাতের টাঁকিভর্তার স্বাদ নিয়েছি বারকয়েক।
শহরের একটু বাইরে বটতলীতে মালেকের বিখ্যাত চায়ের দোকান। মালাই দিয়ে চা খেতে খেতে ভাটিনা গ্রামের কথা শুনি। সেখানে নাকি নানা জাতের অনেক পাখি। ভাটিনা না দেখে চলে যেতে মন চাইল না। তাই দুপুরের পর শামীমের মোটরসাইকেলে রওনা হই আমরা। শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। চিরিরবন্দরের রাস্তা ধরে কিছুদূর গিয়ে একটি বেইলি ব্রিজ পেলাম। ব্রিজে উঠে শামীম জানাল এটি গর্ভেশ্বরী নদী। এখন শুকিয়ে গেলেও একসময় নাকি এর গর্ভ স্পর্শ করা অসম্ভব ছিল। ব্রিজ পেরিয়ে মাস্তান বাজার। দেশের সবচেয়ে বড় টমেটোর বাজার এটি। বাজারের বাঁ দিক দিয়ে ইট বিছানো পথ গেছে ভাটিনায়। দুপাশে লিচু আর আমের বাগান। ঝাঁকড়া চুলের লিচুগাছগুলো দেখতে বেশ। গর্ভেশ্বরী পারের শ্মশানে পেঁৗছাই। কালীপূজার মেলা বসেছে। ভেসে আসে, 'ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, রইব না আর বেশি দিন তোদের মাঝারে'।
গানে ভেসে দুই রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়াই। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধানক্ষেত। ভারী বাতাস সবুজ জমিনে ঢেউ তুলে ছুটে যাচ্ছে। এক বৃদ্ধ কৃষককে জিজ্ঞেস করে মেঠোপথ ধরে এগোতে গিয়ে দেখি সাইনবোর্ডে লেখা 'পাখি সংরক্ষিত এলাকা, পাখি মারা নিষেধ'। বুঝতে পারি এসে গেছি ভাটিনা। বড় একটি পুকুর পেরিয়ে এগিয়ে যাই। গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অনেক বাঁশঝাড়। যতই ভেতরে ঢুকছি ততই পাখির কিচিরমিচির শব্দ চারপাশ থেকে আমাদের ঘিরে ধরছে। আমরা থমকে দাঁড়াই। বাঁশঝাড়ের ডালে ডালে শত শত পাখি। চড়ুই, শালিক, টিয়া, বক, মাছরাঙা, ঘুঘুসহ নানা রকমের পাখি। সবাই বুঝি আনন্দে চেঁচাচ্ছে। পাখিদের মহামিলন উৎসব যেন। আরেকটি বাঁশঝাড়ে সমবেত হয়েছে সহস্র পানকৌড়ি। একটি পানকৌড়িকে ছুটে পালাতে দেখে তাকিয়ে থাকি। দেখি একটি গোশালিক তাকে ঠোকর মারতে তাড়া করছে। পাখিদের আনন্দে আমরা আত্দহারা হয়ে যাই।
একটি আমবাগানে দেখলাম বাদামি রঙের বক আকৃতির অনেক পাখি। চোখ বুজে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। স্থানীয় একজন জানাল, এরা রাতচরা। মুচকি হেসে ভাবি, হয়তো এ কারণেই দিনে ঘুমাচ্ছে। ভাটিনার শত শত একর জমিতে টমেটো আবাদ হয়। একটি টমেটো বাগানে গিয়ে দেখি পাখিদের বসার জন্য বাঁশের ছোট ছোট কঞ্চি গেড়ে দেওয়া হয়েছে। পোকার হাত থেকে রেহাই পেতে এ ব্যবস্থা। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে খেয়ে যাচ্ছে সব পোকা। এভাবে কীটনাশক থেকে পরিবেশ বাঁচে, বাঁচে খরচও।
পাখি ওড়াতে স্থানীয় যুবক আকরামুল বিশেষ কায়দায় শব্দ করতেই ঘটে অবাক করা ঘটনা। হাজার হাজার পাখি গাছ থেকে বেরিয়ে এসে আকাশের দিকে ছুটতে থাকে। অল্পক্ষণে আকাশ ছেয়ে যায় পাখিতে। ভাটিনার বাসিন্দারা এ রকম মন জুড়ানো দৃশ্য দেখে প্রতিদিন। শত শত পানকৌড়ি, সাদাবক, কুনিবক, গুটকল, রাতচরা, ঘুঘু, শালিক, টিয়া আর ময়নার অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এ গ্রাম। এমনটি হয়েছে অনেক দিনের চেষ্টায়। কৃষক নূরু মিয়া জানালেন ১২ বছর আগের কথা। গোটা গ্রামেই ছিল পাখিদের আনাগোনা। ফাঁদ পেতে পাখি ধরা ছিল গ্রামবাসীর দৈনন্দিন ব্যাপার। বিত্তবানরা এয়ারগান চালাতেন দিনভর। দিনশেষে মোটরসাইকেলে মৃত পাখির ঝাঁক ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরত শিকারিরা।
আলোর ভুবন সমিতি প্রথম উদ্যোগ নেয় পাখির অভয়ারণ্য তৈরির। তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী হাশেম তালুকদার মেম্বার। পাখি মারার দীর্ঘদিনের অভ্যাস ছেড়ে নিজের এয়ারগানটি ছুড়ে ফেলে দেন। শপথ নেন পাখি না মারার। সেই শুরু। গোটা গ্রাম মেতে ওঠে পাখিপ্রেমে। পাখিদের সঙ্গে গ্রামবাসীর গড়ে উঠেছে আত্দার সম্পর্ক। ঝড়-বৃষ্টিতে ভাটিনাবাসী বেরিয়ে পড়ে কুলা হাতে। খুঁজে খুঁজে বের করে আহত পাখিগুলোকে। সাধ্যমতো চিকিৎসা দিয়ে বাসায় (বাঁশঝাড়ে) পেঁৗছে দিয়ে আসে।
সূর্য ডুবছে ভাটিনায়।
দূরে গিয়েছিল যারা তারা ফিরে আসছে। পুকুরে ঝাঁপিয়ে দিনশেষের ক্লান্তি দূর করছে কেউ কেউ। পাখিদের এসব দৃশ্য দেখলে কে আর ফিরতে চায়! আজও ভাটিনার কথা মনে হলে উদাস হয়ে যাই।
Source: Daily Kalerkantho
১৪ মার্চ ২০১০

Monday, February 1, 2010

 নিরিবিলিতেই নির্বিঘ্ন জলার পাখি কালিম

নিরিবিলিতেই নির্বিঘ্ন জলার পাখি কালিম

উজ্জ্বল মেহেদী, সিলেট | তারিখ: ০১-০২-২০১০

টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে পাটনাই নদীর আলঙেরদুয়ার পৌঁছালেই সারি সারি হিজল-করচের বেষ্টনীর দেখা মিলবে। প্রাকৃতিক এই বেষ্টনী যেন হাওর থেকে নদীকে আলাদা করে রেখেছে। হিজল-করচের সবুজ সারির পরই হাওরের নলখাগড়ার ঝোপঝাড়। দূর থেকে কানে আসে পাখির ডানা ঝাপটানো, ওড়াউড়ি আর ডাকাডাকির শব্দ। চুপিসারে কাছে যেতে পারলে চোখ রীতিমতো ছানাবড়া হয়ে যাবে। বেগুনি পশম, কপালে লাল তিলকের ঝিলিক মেখে জলাভূমিতে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। শয়ে শয়ে পাখি প্রায় ১০-১২টি পালে বিভক্ত হয়ে কলরবে মেতেছে। জলার এ পাখির নাম—কালিম। কালিম পাখির নিবাস সিলেট ও মৌলভীবাজার বিস্তৃত হাকালুকি এবং সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে। পাটনাই নদীর আলঙেরদুয়ার পেরিয়ে জয়পুর থেকে গোলাবাড়ি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ নলখাগড়ার বন ও ঝোপঝাড়ে দেখা মেলে কালিম পাখির। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার পর ২০০৩ সাল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের ৪৬টি বিলের ইজারা প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। নিরিবিলি পরিবেশ পেয়ে কালিম পাখির সংখ্যা বাড়ছে বলে গ্রামবাসী জানায়। পাখিশুমারির তথ্যানুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওরে কালিম পাখির সংখ্যা বেশি। গত শীতকালের পাখিশুমারি অনুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওরে পাঁচ হাজারের বেশি এবং হাকালুকিতে দুই হাজারেরও বেশি কালিম পাওয়া গেছে। বিপদাপন্ন পাখি কালিম: পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, কালিম পৃথিবীর বিপদাপন্ন প্রজাতির জলাভূমির পাখি। বাংলাদেশে শুধু সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোর বন-ঝোপঝাড়ে এ পাখির বসবাস। পাখিটি দেখতে কুড়া বা মুরগির মতো। এ পাখির পরিচিতি প্রসঙ্গে পাখি বিশারদ শরীফ খানের বাংলাদেশের পাখি গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, শুধু সিলেট অঞ্চলে বিচরণকারী কালিম পাখির নানা রকম নাম রয়েছে। ‘করমা’ নামেও পরিচিত এই পাখি। কালিম পাখি ৪৫-৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হয়। হাকালুকি হাওরে পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘উপকূলীয় ও জলাভূমি জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের (সিডব্লিউবিএমপি) প্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, দিনের বেলা জলে ভাসমান লতাপাতা, কীটপতঙ্গ খায় এ পাখি। রাতে এরা জলাভূমির পাড়ে হিজল, করচ, বরুণের ঝোপঝাড়ে থাকে। নিরিবিলিই কী কাল?: বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও শীত মৌসুমে সিলেট নগরে পাখির বেচাকেনা বেড়ে যায়। পাখি বিক্রির এ চিত্রে নানা প্রজাতির অতিথি পাখি ছাড়াও হঠাত্ দেখা মেলে জলাভূমির সৌন্দর্যখ্যাত বিপদাপন্ন কালিম পাখির। বিক্রেতার মুখে তখন শোনা যায়, ‘বিরল পাখির দ্বিগুণ দাম’। সাধারণত ব্যস্ত এলাকাগুলো পাখি বিক্রির স্থান হিসেবে চিহ্নিত। ব্যস্ততার আড়ালে চলে বিক্রি। বিক্রেতাদের ভাষ্য, কালিম পাখির অভয়ারণ্য নিরিবিলি হওয়ার সুযোগে শিকারিরা ফাঁদ পেতে অক্ষতভাবেই পাখি তাদের হাতে তুলে দেয়। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ পরিদর্শক সরদার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘শিকারিদের তত্পরতা এত আড়ালে চলে যে হাতেনাতে ধরা খুব কঠিন।’ সিলেট বিভাগীয় বন সংরক্ষক (ডিএফও) মো. দেলওয়ার হোসেন জানান, বন বিভাগের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কমিটির তত্ত্বাবধানে পাখি বিক্রি বন্ধে তত্পরতা চালানো হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, যখন এ কমিটি বাজারে যায়, তখন পাখি বিক্রেতারা আড়ালে চলে যায়। তবে বাংলাদেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট অঞ্চলের সমন্বয়কারী আয়েশা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাখি শিকার ও বিক্রি দুটোই যেহেতু আইনত নিষিদ্ধ, তাই এ দুই ক্ষেত্রে সমান আইনি পদক্ষেপ চালানো যেতে পারে। শিকার বন্ধ হলে বিক্রেতা বিক্রির জন্য পাবে না। এ জন্য শুধু আইনি পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন জনসচেতনতার।’

Source:

Prothom Alo